বিয়ানীবাজারে শিশু হত্যার ৪ দিনের রিমান্ড শেষে নাহিদুল কারাগারে, স্বীকারোক্তি মিলেনি

প্রকাশিত: ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২০, 729 জন দেখেছেন

নিজস্ব সংবাদদাতা:: সিলেটের বিয়ানীবাজারে সাড়ে ৩ বছরের শিশু সুহেল হত্যায় মানবাধিকার কর্মী নাহিদুল ইসলাম ওরফে ইব্রাহীমের ৪ দিনের রিমা- শেষ হয়েছে। এ সময়ে পুলিশ তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করতে পারেনি। গতকাল শুক্রবার তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। এ মামলায় অপর আসামীকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।

এদিকে, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ প্রচার সম্পাদক ও সিলেট জেলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আইন সহায়তা ফাউন্ডেশনের সমাজসেবা সম্পাদক নাহিদুল ইসলামের উপর ‘মিথ্যা’ মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গত বুধবার তার গ্রামবাসী চারখাই বাজারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। এতে বিভিন্ন পেশার বিপুল সংখ্যক লোক শরিক হন। এ সময় বক্তারা, নাহিদুলকে ‘নির্দোষ’ উল্লেখ করে অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন।

এদিকে, পরকীয়া প্রেমের জের ধরে শিশু সুহেল হত্যার ঘটনাকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না উত্তর আকাখাজানাবাসী। তাদের অনেকেই, নাহিদুলকে জড়িয়ে আত্মস্বীকৃত খুনি সুরমা বেগমের দেয়া তথ্যকে উদ্ভট এবং বিভ্রান্তিকর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তারা বলেন, সুরমা বেগম নাহিদের সম্পর্কে মামী হন এবং ওই মহিলা ‘পতিতাবৃত্তি’র সাথে জড়িত। তার সাথে নাহিদের পরকীয়া প্রেমের প্রশ্নই উঠে না। এলাকাবাসী সঠিক তদন্তের মাধ্যমে শিশু খুনের রহস্য উন্মোচনের জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান।

উত্তর আকাখাজানা প্রবাহ সংঘের সভাপতি সিপলু আহমদ বলেন, ‘নিখোঁজ শিশু সুহেলকে পাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজিতে নাহিদুল আমাদের সাথে ছিল। এমনকি সে-ই সুহেলের লাশ পাওয়ার কথা পুলিশকে জানিয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের বিশ্বাস, পারিবারিক কলহের জের ধরে এ হত্যাকা- হয়েছে। এখানে নাহিদুলকে পূর্ব শত্রুতাবশত: জড়ানো হয়েছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তিনি রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানান।’

এলাকাবাসী ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত রোববার সকালে আম কুড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হয় উপজেলার কুড়ারবাজার ইউনিয়নের উত্তর আকাখাজানা গ্রামের খসরু মিয়ার পুত্র সায়েল আহমদ ওরফে সুহেল। এ সময় তার বড় ভাই আরিফ ঘরে ফিরে আসে। কিন্তু দীর্ঘসময় পরও সুহেল না ফেরায় দিনভর ফেসবুক, মসজিদে মাইকিং কিংবা পুকুরে জাল ফেলাসহ নানাভাবে খোঁজে সুহেলকে পাওয়া যায়নি। এসব কাজে পুরোদমে সহযোগিতা করেন নানাবাড়িতে বসবাসরত নাহিদুল ইসলাম (২৬) ওরফে ইব্রাহীম। এমনকি পুলিশ বাড়িতে এলেও নাহিদ গা-ঢাকা দেননি। কিন্তু এজাহারভুক্ত অপর আসামী সুরমার স্বামী হঠাৎ করে পলাতক হন।

এদিকে, সময় গড়ানোর সাথে সাথে প্রতিবেশী সুরমা বেগম (৩৮) ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখাসহ রহস্যজনক আচরণ শুরু করেন। এতে এলাকাবাসীর সন্দেহ হলে তার বসতঘরে তল্লাশিকালে সন্ধ্যা ৬টার দিকে সুরমা বেগমের গোসলখানায় রাখা ড্রামের ভিতর কম্বল দিয়ে মোড়ানো শিশু সুহেলের নিথর দেহ পাওয়া যায়। এ সময় সুরমা বেগম এলাকার বেশক’জন যুবকের সামনে শিশু সুহেল হত্যার বিবরণ দেন। কিন্তু এ ঘটনায় নাহিদের সংশ্লিষ্টতার কথা তিনি ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করেননি। একাধিক যুবক সে সময়কার কথোপকথন নিজেদের মোবাইলে ধারণ করেছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে সুরমা বেগম জানিয়েছে, সুহেল আম কুড়ানো শেষে তার ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে নাহিদুল ও তার অনৈতিক মেলামেশা দেখে চিৎকার শুরু করে। তখন নাহিদুলের নির্দেশে সুরমা বেগম গাছের ডাল দিয়ে প্রথমে শিশুর মাথায় আঘাত করে। এ অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তখন দু’জনে শিশুর নাক-মুখ চেপে ধরে হত্যা করে কম্বল দিয়ে ঢেকে গোসলখানায় থাকা একটি প্লাস্টিকের ড্রামে ঢুকিয়ে রাখে।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং শিশু সুহেল হত্যাকা- নিয়ে এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবী মনসুর আহমদ বলেন, সুরমার বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। তার বক্তব্য বিবেকবান মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না বলে মন্তব্য তার।

সূত্রমতে, ৪ দিনের রিমা-ে পুলিশ নাহিদুলের কাছ থেকে সুহেল হত্যায় জড়িত থাকার কোনো তথ্য-প্রমাণ উদ্ধার করতে পারেনি। বরং সে পুলিশকে জানিয়েছে, ‘সুহেল হত্যার দিন আত্মীয়দের ডাকে সকাল ৮ টায় তার ঘুম ভাঙে। এরপর এলাকাবাসীর সাথে সুহেলকে খুঁজে বেড়ায়। সন্ধ্যা ৬ টায় সুরমা বেগমের ঘরে সুহেলের লাশ পাওয়া গেলে প্রথমে সে পুলিশকে জানানোর জন্য ফোন করে উপজেলা চেয়ারম্যানকে বিষয়টি অবহিত করে। তখন সুরমা বেগম তার সকল কর্মকা- লক্ষ্য করছিলেন। এছাড়া তার মামার পরিবার ও তার সাথে সুরমা বেগমের নানা বিষয় নিয়ে ঝগড়া-বিবাদের কথা তিনি পুলিশকে জানান।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হারুনুর রশীদ এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে বলেন, রিমা- চলাকালে আমরা নাহিদুলের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পাইনি। তবে তদন্তে সহায়ক অনেক তথ্য পেয়েছি। তিনি বলেন, সুরমার স্বামী রুনু মিয়াকে গ্রেফতার করলে শিশু সুহেল হত্যার জট পুরোপুরি খুলে যাবে। দু’একদিনের মধ্যে এজাহারভুক্ত এ আসামীকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলেও পুলিশের এ কর্মকর্তা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

উল্লেখ্য, শিশু সুহেল হত্যার পরদিন তার পিতা খসরু মিয়া বাদী হয়ে ৩ জনের নামোল্লেখ করে বিয়ানীবাজার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ৬। এ ঘটনায় সুরমা বেগম ও নাহিদুল ইসলাম কারাগারে রয়েছেন। অপর আসামী পলাতক রয়েছেন।