করোনা ভাইরাসের কারণে এ বছর স্থগিত করলো মাতাই পুখিরীর (দেবতা পুকুর) তীর্থমেলা

প্রকাশিত: ৫:৫২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৯, ২০২০, 761 জন দেখেছেন

স্টাফ রিপোর্টার, খাগড়াছড়িঃ  করোনা ভাইরাসের কারনে এ বছর স্থগিত করলো মাতাই পুখিরীর (দেবতা পুকুর) তীর্থমেলা। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সদর উপজেলাধীন নুনছড়িতে অবস্থিত মাতাই পুখিরী (দেবতা পুকুর) মুলত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর তীর্থক্ষেত্র।

প্রতি বছর বৈসাবি (বৈসু,সাংগ্রাই,বিঝু) ও বাংলা নববর্ষ উৎসব উপলক্ষে চৈত্র মাসের শেষ ২ দিন এবং পহেলা বৈশাখের প্রথম দিনসহ মোট ৩ দিন ব্যাপি নুনছড়ির মাতাই পুখিরীতে (দেবতা পুকুর) তীর্থমেলা অনুস্থিত হয়। কিন্তু এ বছর বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে সেই মাতাই পখিরীতে (দেবতা পুকুর) তীর্থ মেলা হবে না বলে জানিয়েছেন সেখানকার তীর্থ মেলা উদযাপন কমিটি।

তীর্থ মেলা উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের কারনে যে পরিস্থিতি উদ্ভব হয়েছে এ পরিস্থিতিতে করণীয় ও বর্জনী সম্পর্কে সরকার যথাযথভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ এবং প্রচার-প্রচারণা করায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।

ইতোমধ্যে সরকার করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ প্রতিরোধের জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জনসমাগম না হয়ে নিজ ঘরে প্রার্থনা করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।

প্রতিবছর মাতাই পুখিরীতে ( দেবতা পুকুর) উৎসব মুখর পরিবেশে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী সারাও বিভিন্ন সস্প্রদায়ের লাখো পূর্ণ্যার্থীর মিলনমেলা হয়।

এমতাবস্থায়, এ বছর বৈসাবি (বৈসু,সাংগ্রাই,বিঝু) ও বাংলা নববর্ষ উৎসব উপলক্ষে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলাধীন নুনছড়ি মাতাই পুখিরী ( দেবতা পুকুর) তীর্থ মেলা ও শিব মন্দিরে কোন প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান হচ্ছে না। পাশাপাশি সকল ধর্মপ্রাণ নর-নারী,পূর্ণ্যার্থ তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থীদেরকে তীর্থক্ষেত্র এবং শিব মন্দিরে জনসমাগম না হওয়ার জন্য মেলা উদযাপন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে সকলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন মেলা উদযাপন কমিটির সভাপতি ক্ষেত্র মোহন রোয়াজা।

মাতাই পুখিরীর (দেবতা পুকুর) কিছু কথা: খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার নূনছড়ি মৌজায় আলুটিলা পর্বত শ্রেণী হতে সৃষ্ট ছড়া নূনছড়ি। নূনছড়ি ছড়ার ক্ষীণ স্রোতের মাঝে রয়েছে প্রকান্ড ছোট বড় পাথর। সেই স্বচ্ছ জলস্রোতের স্থির পাথর মোহিত করে সেখানে ছুটে আসা পূর্ণ্যার্থীদের। প্রকৃতির অপূর্ব সাজে মুগ্ধতায় শিহরিত করে লাখো মানুষের মন। সমুদ্র সমতল হতে প্রায় ১০০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের চূড়ায় সেই ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর তীর্থস্থান মাতাই পুখিরী (দেবতা পুকুর)। রূপকথার দেবতার আর্শীবাদের মতো সলিল বারির স্রোতহীন সঞ্চার এই মাতাই পুখিরী (দেবতা পুকুর)। এ পুকুরটির স্বচ্ছ জলরাশির মন ভোলানো প্রশান্তি মূহুর্তের মাঝে পর্যটকদের হৃদয় উদাস করে দেয়। এত উঁচু পাহাড় চূড়ায় পুকুরটি নানা রহস্যে ভরপুর । এ পুকুর ত্রিপুরাদের তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিগণিত। প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তিতে এখানে তীর্থ মেলা বসে এবং তান্ত্রিক বিধানমতে ত্রিপুরাগণ যাগযজ্ঞাদি করে। ত্রিপুরাদের কাছে এই তীর্থক্ষেত্রটি মাতাই পুখিরী (দেবতা পুকুর) নামে খ্যাত। মাতাই অর্থ দেবতা আর পুখিরী অর্থ পুকুর। পুকুরের চতুর্দিকে ঘন বন দেখে মনে হয় যেন সৌন্দর্য্যের দেবতা স্বয়ং বর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কথিত আছে স্থানীয় বাসিন্দাদের জল তৃষ্ণা নিবারণের জন্য জল দেবতা স্বয়ং এ পুকুর খনন করেন। পুকুরের পানিকে স্থানীয় লোকজন দেবতার আশীর্বাদ বলে মনে করেন। এ পুকুরের পানি কখনো শুকিয়ে যায় না। প্রচলিত আছে যে, এই পুকুর কোন দেবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং পুকুরের তলায় বহু গুপ্তধন লুকায়িত আছে যা দেবতারা পাহাড়া দিচ্ছে। অনেকের ধারণা এখানে এসে কিছু চাইলে তা পূরণ হয়। এ এলাকাটি ত্রিপুরা অধ্যুষিত। কথিত আছে বর্তমান মাতাই পুখিরী (দেবতা পুকুর) এলাকা এক সময় উঁচু পাহাড়ী অঞ্চল ছিল। এ উঁচু পাহাড়ের পাশে দু’টো জনবসতি ছিল। এ জনবসতির এ জুমিয়া এক সময় ঐ পাহাড়ে জুম চাষ করতে চেয়েছিলো। জুম চাষিকে এক পর্যায়ে ঐ পাহাড়টিতে আবাদ না করার জন্য তাকে স্বপ্নে বারণ করে। কিন্তু স্বপ্নের গুরুত্ব না দিয়ে এমনকি বারবার একইভাবে স্বপ্নে নিষেধ করা সত্বেও সে যথারীতি জুম চাষ চালিয়ে যায়। শেষবারে তাকে নরবলী দিয়ে জুমের ফসল ভোগের জন্য বলা হয় এবং তা করলে সে আরো কিছু ধন লাভ করবে বলেও স্বপ্নে জানানো হয়। কিন্তু এ দাবী পূরণে জুয়িার বিশ্বাস এবং সামর্থ্য কোনটাই ছিল না। এর কিছুদিন পর এক অমাবশ্যার রাতে ঐ স্থানে এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে আশে-পাশের লোকেরা দেখতে পায় জুমের জায়গায় পাহাড়ের উপরে বিরাট এক জলাশয়। এ জলাশয়ই মাতাই পুখিরী (দেবতা পুকুর) নামে পরিচিত।

এ মাতাই পুখিরী (দেবতা পুকুর) বর্ষাকালে পানিতে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং বছরের কোন সময়ে শুকিয়ে যায় না। পুকুরের চারিদিক সুবিস্ত্রীত পর্বতশ্রেণী। তারই মাঝে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বিভাবে প্রায় ১০০০ ফুটের উপর এর অবস্থান। পুকুরের আকার দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৫০০ ফুট এবং প্রস্থে প্রায় ৬০০ফুট।