বন্ধ হলো দুই জেলার অবস্থিত সিন্দুরমতির মেলা

প্রকাশিত: ৫:০৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০২০, 866 জন দেখেছেন

রাশেদ কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য দেশব্যাপি চলছে নানান পদক্ষেপ। এরই ধারাবাহিকতায় বাতিল করে দেয়া হলো রাজারহাট ও লালমনিরহাট সদর উপজেলার কোল ঘেঁষে অবস্থানরত সিঁন্দুরমতি মেলা।

আগামী ২ এপ্রিল এই মেলা হওয়ার কথা ছিল। আইন শৃঙ্খলা রাহিনীর সাথে কথা বলে গত ২৭ মার্চ মন্দির পরিচালনা কমিটির সভায় মেলা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

উল্লেখ্য প্রতি বৎসর চৈত্র মাসের নবমীর দিনে বাসন্তী উৎসবে লালমনিরহাটের একটি প্রত্যন্ত এলাকায় ঐতিহ্যবাহী কিংবদন্তির সিন্দুরমতি পুকুরে হিন্দু ধর্মাম্বলীদের মহানবমীর পূণ্যস্নানে ভক্ত পূণ্যার্থী ও উৎসুক মানুষের ঢল নামে । সকাল থেকে বাসন্তি উৎসব উপলক্ষে পুকুর পাড়ের চারদিকে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী সিঁন্দুর মতি মেলা। সিঁন্দুরমতির সু-বিশাল পুকুর উত্তরাঞ্চলের হিন্দু ধর্মাম্বলীদের তীর্থস্থান। প্রতিবছর হিন্দু ধর্মাম্বলী ভক্ত-পূণ্যার্থীরা পাপমোচন ও জীবণে ব্যপ্ততা এবং পরজনমে পূণ্যবান হওয়ার আশায় নবম তিথিতে সিঁন্দুরমতি পুকুরে গোসল করে থাকেন।

এতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত সহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ভক্তবৃন্দের আগমন ঘটে। এ উপলক্ষে পুকুর পাড়ে চলে ঐতিহ্যবাহী সিঁন্দুরমতি মেলা।কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার শেষ সীমানা ও লালমনিরহাট জেলা সদরের প্রত্যন্ত গ্রামে এটি অবস্থিত। উত্তরাঞ্চলের কিংবদন্তি পুকুর সিঁন্দুর মতির ইতিহাসের কথা বহু দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।

অনেক স্থানের হিন্দু ধর্মাম্বলীরা পুরাকীর্তির নিদর্শন স্বরূপ পুকুরটিকে ভগবানের স্বর্গীয় দান মনে করেন। কথিত আছে, হাজার বছর আগে শ্রীলঙ্কায় নারায়ণ চক্রবর্তী নামের একজন ধার্মিক ও দাতা জমিদার ছিলেন। জমিদারের স্ত্রী মেনেকা দেবী নিঃসন্তান হওয়ায় জমিদার সন্তান লাভের আশায় স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করে নিজ স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন তীর্থ স্থান ভ্রমন করতে লাগলেন। অবশেষে জমিদার নারায়ণ চক্রবর্তী বঙ্গদেশের উত্তর জনপদে প্রসিন্ধ দেউল সাগরে এসে পৌঁছেন।

এখানে তিনি গড়ে তোলেন ঐশ্বর্য্যময় এক শান্তির লীলাভূমি। জমিদার ও তার স্ত্রী আরাধনায় ভগবান সন্তুষ্ট হন। মেনেকা দেবী লাভ করেন চন্দ্রিকা সাদৃশ্য দুই কন্যা । সুচরিত জমিদার স্ত্রী আদর করে কন্যাদ্বয়ের নাম রাখেন সিন্দুর ও মতি। একদা রাজ্যে তীব্র খরা দেখা দেয়। নদী-নালা, খাল-বিল সব ফেটে চৌঁচির। দিনে আগুন ঝরা রোদ। প্রজা হিতৈষী জমিদার রাজ প্রসাদের অনতি দূরে প্রায় ১৭ একর জমির উপর শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অল্প দিনের মধ্যে বিশাল আকৃতির একটি পুকুর খনন করান। আশ্চার্য্যরে বিষয় পুকুরে এক ফোটা জলও উঠল না। ভগবান জমিদারকে রাতেই স্বপ্নাদেশ করলেন,তোমার দু’কন্যা সিঁন্দুর ও মতিকে নিয়ে জলবিহীন পুকুরের তল দেশে পুঁজা অর্চনা করলে ওই পুকুরে জল আসবে। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী জমিদার কাল বিলম্ব না করে চৈত্রের নবমীতে পুঁজা অর্চনার আয়াজন করান। দু’ বোন সোনার বরণডালা নিয়ে পুকুর ঘাটে চলে আসলো ।

পুজারীরা শঙ্খধ্বনি,বাদ্যকরেরা ঢাক-ঢোল,তবলা বাজাতে লাগলেন । হঠাৎ বিকট শব্দে পুকুরের তলদেশ ভেদ করে তীব্রবেগে জলরাশি বের হল । নিমিষে পুকুরটি জলে টইটম্বুর হয়ে গেল। বাদ্যকরেরা কোন রকম সাতাঁর দিয়ে ডাংগায় ওঠে প্রাণ বাঁচাল। কিন্তু সিঁন্দুর ও মতি আর ভেসে উঠল না। ভগবান এক রাতে জমিদারকে স্বপ্নাদেশে জানালেন তার দু কন্যার মৃত্যু হয়নি। পুকুরের তল দেশে দেবত্তর প্রাপ্ত হয়ে তারা চিরত্ব লাভ করেছে।

তিনি সরাসরি তার দু’কন্যাকে দেখতে চাইলে ভগবান জমিদারের মনোবাসনা পূর্ন করেন। মনোবাসনা অনুযায়ী ঘটনার অষ্টম দিনে অরুণাদয়ের পূর্বে জমিদার ও তার পতœীকে পুকুরের ভাসমান জলে জ্যোর্তিময় মন্ডলে সিঁন্দুর ও মতির শাড়ি আচল ও কনিষ্ঠ আঙ্গুল দেখালেন। এতে তারা আবেগাপ্লুত নয়নে অভিভূত হয়ে সিঁন্দুর ও মতির সঙ্গে কথাও বলেন। পরবর্তীতে সিন্দুরমতির নামনুসারে পুকুরটির নাম করণ করা হয় সিন্দুরমতি।