২৫ বছর ধরে বিঘাপতি ২০০ টাকায় সেচ প্রদান করে আসছেন- মতিন সৈকত

প্রকাশিত: ১২:০৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২০, 954 জন দেখেছেন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় কৃষি খাতের অবদান অপরিসীম। খাদ্য শস্য উৎপাদন ও কৃষি উদ্ভাবনে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসনীয়। এ সম্ভাবনা ও সাফল্য পুরো জাতিকে উদ্বুদ্ধকরণে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছে সরকার এবং সংগ্রামী কৃষক। কৃষিখাতে অবদান রেখে কৃষক বন্ধু হিসাবে দেশব্যাপি প্রশংসিত হয়েছেন কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার আদমপুর গ্রামের মতিন সৈকত। তার বাবা মোঃ কেরামত আলী ছিলেন সমাজকর্মী এবং মধ্যবিত্ত কৃষক। মতিন সৈকত বাবার আদর্শ লালন করে বেড়ে উঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা সাহিত্যে অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে ১৯৯৮ সাল থেকে অধ্যাপনায় নিযুক্ত আছেন।

মতিন সৈকত ১৯৯৭ থেকে ২৫ বছর যাবত মাত্র ২০০ (দুইশ) টাকা বিঘাপ্রতি মৌসুমব্যাপি বোরোধানে সেচ সুবিধা দিয়ে সারা দেশে সাড়া জাগিয়েছেন। যে কোনে জায়গায় বিঘাপ্রতি বোরোধানে মৌসুমে কৃষকদেরকে ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত সেচের খরচ দিতে হয়। সুখবর হচ্ছে নানা দূর্যোগে এবং চড়া বাজারেও মতিন সৈকতের সেচের টাকার পরিমাণ আগের মতোই মাত্র দুইশ টাকা রেখে চলছেন।

দাউদকান্দি উপজেলার আদমপুর, পুটিয়া ও সিঙ্গুলা গ্রামের ১৫০ বিঘা জমিতে সিকি শতাব্দী যাবত মাত্র দুইশ টাকা মৌসুমব্যাপি সেচের পানি সরবরাহ করে মতিন সৈকত জাতীয়ভাবে দৃষ্টান্ত স্হাপন করেছেন।
সরেজমিনে জানা যায়, এক সময় ওই সব জমিতে বোরো ধান ছাড়া কিছুই হতো না। মতিন সৈকতের উদ্যোগে সে মাঠের জমিতে ২০০০ সালে আর্থ -সামাজিক উন্নয়নে সমবায় ভিত্তিতে আপুসি মৎস্য প্রকল্প প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়াও তিনি আপুবি ও বিছমিল্লাহ মৎস্য প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। এ প্রকল্পে মাছ চাষ করার ফলে চাষিদের মুখে হাসি ফুটছে। একদিকে প্রায় বিনামূল্যে বোরো ধান চাষ অন্যদিকে বর্ষাকালে একই জমিতে মাছ চাষ করে বিঘাপ্রতি ২০ হাজার টাকা পাচ্ছেন কৃষক। একসময় এলাকায় জমির দাম ছিল কম। চাষাবাদ লাভজনক হওয়ায় এখন সেখানে জমির দাম বেড়েছে।
এখানেই শেষ নয়, কৃষক বন্ধু মতিন সৈকত নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনের জন্য ক্ষতিকর বালাইনাশক ব্যাবহার বন্ধ করে জমিতে জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনে কৃষককে উৎসাহিত করেছেন। তিনি দাউদকান্দি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ১৫৪টি আইপিএম ও আইসিএম ক্লাব সংগঠিত করেছেন। এর মাধ্যমে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা করেন। প্রযুক্তি ব্যবহারেও কৃষকদের উদ্ধুদ্ধ করেন। এ ছাড়া নিজস্ব নার্সারির মাধ্যমে চারা উৎপাদন, মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ, বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা করে স্থানীয়দের মাঝে বেশ সুখ্যতি অর্জন করেছেন।
দাউদকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সারোয়ার জামান বলেন, ‘মতিন সৈকত উপজেলার কৃষকদের খুব আপনজন। সরকারের পাশাপাশি তৃণমূলে কৃষকের পাশে থেকে সব সময় সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন। তিনি ২৫ বছর ধরে নাম মাত্র মূল্যে মাত্র দুইশ টাকায় বিঘাপ্রতি সেচ ব্যবস্থা করে কৃষকদের সেবা দিয়ে আসছেন। তিনি কৃষকদের যেভাবে সংগঠিত করে তাদের সহযোগিতা করছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।’’
দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) মোহাম্মদ আলী সুমন বলেন “মতিন সৈকত কে দাউদকান্দির কৃতী সন্তান হিসেবে রাষ্ট্রপতি অভিনন্দন পত্র দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে দুইবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক প্রদান করেছেন। তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে চারবার চট্টগ্রাম বিভাগে প্রথম স্হান অর্জন করেছেন। আমরা মতিন সৈকতকে নিয়ে গর্ববোধ করি।” জাতীয় সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অবঃ) মোঃ সুবিদ আলী ভূইয়া লেখেন” মতিন সৈকত কৃষি, পরিবেশ উন্নয়নে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে জাতি গঠনে অবদান রাখছেন”। তিন দশকের বেশি সময় ধরে মতিন সৈকত বিষমুক্ত ফসল, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, খাল-নদী পূনঃখনন, প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পাখি ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও অবমুক্ত করণ, সবুজায়ন আন্দোলন, মহাসড়কের পাশের এবং শহর নগরের ময়লা আবর্জনাকে থেকে সিটিজেন ফার্টিলাইজার বা নাগরিক সার প্রক্রিয়াকরণ সহ বহুমুখী সামাজিক আন্দোলনে নিরন্তর নেতৃত্ব দিয়ে চলছেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, রেডিও টেলিভিশন তার সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডের প্রতিবেদন প্রচার করে তাকে উৎসাহিত করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা বিবিসি টেলিভিশন তার ডকুমেন্টারি প্রচার করে। জাতি সংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্হা এফ,এ ও, – ডি,এফ,আই,ডি, ইউ এন ভলন্টিয়ার্স এবং কানাডা বাংলাদেশ সেন্টার তাকে অভিনন্দন জানান। মিডিয়া ব্যাক্তিত্ত শাইখ সিরাজ, রেজাউল করিম সিদ্দিকী, মুন্নী সাহা, রামেন্দু মজুমদার সহ অনেকে তাকে টেলিভিশনে প্রামাণ্য অনুষ্ঠান করেন।