দেশের মধ্যে প্রথম তথ্য সেবায় বদলে যাচ্ছে উখিয়ার ‘ডিজিটাল গ্রাম’

প্রকাশিত: ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২২, 46 জন দেখেছেন

আবদুর রহিম, কক্সবাজার :: তথ্যসেবায় বদলে যাচ্ছে দেশের প্রথম ‘ডিজিটাল গ্রাম’ তুলাতুলী। কক্সবাজারের উখিয়ার রত্নাপালং ইউনিয়নে তুলাতুলী গ্রামের অবস্থান। এই গ্রামে ডিজিটাল ভিলেজ সেন্টার স্থাপন করেছে সরকার। গ্রামের কৃষক থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষ সেন্টার থেকে পাচ্ছেন ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা। এই সেন্টারে সেবা নিতে আসেন আশপাশের গ্রামের মানুষজনও। তথ্যসেবার পাশাপাশি কৃষকদের কৃষিপণ্য বিক্রি, সবজি চাষ ও রোপণ, পোকা দমনসহ নানাভাবে পরামর্শ পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন কৃষকরা। ইতিমধ্যে গ্রামটিকে দেশের প্রথম ‘ডিজিটাল গ্রাম’ ঘোষণা করেছে সরকার।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সম্প্রতি গ্রামটিতে ডিজিটাল ভিলেজ সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এটির উদ্বোধন করেছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।

ডিজিটাল ভিলেজ সেন্টারের মাধ্যমে এই অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বেচাকেনা, কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন, উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে ক্রেতাদের সম্পর্ক সৃষ্টি, অনলাইনের মাধ্যমে কৃষিবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত প্রদান, রোগবালাই প্রতিরোধ, উৎপাদিত পণ্যের বাজার দর ও বাজারজাত নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন।

তুলাতুলী গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, ‘তুলাতলী গ্রামে যথেষ্ট পরিমাণ সবজি উৎপাদন হয়। উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য পেতেন না কৃষকরা। সরকার গ্রামটিকে ডিজিটাল গ্রাম ঘোষণার পর থেকে নড়েচড়ে বসেছেন কৃষকরা। তারা ডিজিটাল সেন্টারে সবজি বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। এতে কৃষকরা খুশি। এ জন্য উন্নয়ন ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে গ্রামটি।’

ওই গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘আমরা কীভাবে সবজির চাষ করবো, কীভাবে পোকা দমন করবো, সার ও রাসায়নিক ছিটানোর পদ্ধতিসহ নানা পরামর্শ পাচ্ছি ডিজিটাল কৃষি সেন্টার থেকে। এতে তুলাতলীসহ আশপাশের গ্রামের কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন।’

স্থানীয় কৃষক আবুল আলা বলেন, ‘ক্ষেতে উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করতে যে সময় ব্যয় হতো, এখন সেই সময় বেঁচে যাচ্ছে। কারণ সকাল-বিকাল ডিজিটাল সেন্টারে এনে কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারছি।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহ আলম, ‘তুলাতলী দুর্গম এলাকা। এখান থেকে উখিয়া উপজেলা সদর অথবা কক্সবাজার জেলা সদরে যাওয়া দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। এমনকি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদও দূরে। এ কারণে সরকার তুলাতলী গ্রামকে ডিজিটাল গ্রামের আওতায় এনে তথ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করেছে; এতে গ্রামবাসী উপকৃত হচ্ছেন। বলা যায়, গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা বদলে গেছে।’

স্থানীয় আরেক ব্যবসায়ী শফিউল আলম বলেন, ‘তথ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে ভোটার আইডি থেকে শুরু করে পাসপোর্ট ফরম পূরণসহ সব ধরনের কাজ হয়। এ জন্য আমাদের উপজেলা সদরে যেতে হয় না। এখন ঘরে বসে ডিজিটালের সব সুবিধা পাচ্ছি।’

তুলাতলী তথ্যসেবা কেন্দ্রের কর্মকর্তা নুরুল কবির বলেন, ‘ডিজিটাল গ্রামের তথ্যসেবা কেন্দ্রে অনলাইনের মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু জমির খতিয়ান, ক্ষেত-খামারের পরিচর্যা ও পোকা দমনের পরামর্শ এবং যন্ত্রপাতিসহ নানা সেবা দেওয়া হয়। ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে সব ধরনের চাকরির আবেদন, পাসপোর্টের আবেদন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, জন্মনিবন্ধন, ভোটার আইডি কার্ডের ভুল সংশোধন ও উত্তোলনের আবেদন, বিদ্যুতের মিটারের জন্য আবেদন, করোনার টিকার আবেদন ও সার্টিফিকেট উত্তোলন, ই-মেইল, কৃষকের ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও পরীক্ষার ফল উত্তোলন, অনলাইনে ফরম পূরণ, প্রিন্টিং, স্ক্যানিং ও ফটোকপিসহ নানা কাজ করা হয়।’

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে গ্রামকে শহরে পরিণত করার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা শুনে ডিজিটাল সেন্টারের জন্য জমিদান করেন স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম। জমিদাতা বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন দুবাই থেকেছি। বিদেশের নিয়ম-কানুনগুলো দেখে নিজেকে অনেক অসহায় মনে হতো। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘‘আমার গ্রাম আমার শহর’’ ঘোষণায় আমি ডিজিটাল সেন্টারের জন্য জমি দিতে আগ্রহী হই। কারণ দেশ এখন ডিজিটাল ব্যবস্থায় এগিয়ে যাচ্ছে। এই জমিদানের মাধ্যমে আমার এলাকার কৃষক ও সাধারণ মানুষ সুযোগ-সুবিধা পেলে গ্রামটি উন্নত হবে। সেই চিন্তা থেকে জমি দিয়েছি।’

ডিজিটাল গ্রাম তুলাতুলীতে তথ্যসেবা কেন্দ্র উদ্বোধন করতে এসে প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, ‘দেশের আট হাজার ইউনিয়ন পরিষদে ডিজিটাল ইনফরমেশন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। যেটি মানুষের সেবার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির দিকে সবাইকে ধাবিত করেছে। এরই অংশ হিসেবে তুলাতলী গ্রামকে ডিজিটাল গ্রাম ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে কৃষক থেকে শুরু করে এই জনপদের মানুষ তথ্যসেবা পাবে।’

উল্লেখ্য, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের কৃষকদের জন্য ৫০টি গ্রামকে ‘ডিজিটাল ভিলেজ’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে এস্টাবলিশমেন্ট অব ডিজিটাল কানেকটিভিটি (ইডিসি) মেগা প্রকল্পের অধীন একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে তুলাতলী গ্রামকে ‘ডিজিটাল ভিলেজ’ ঘোষণা করা হয়।