৩ বার জাতীয় পদক প্রাপ্ত মতিন সৈকত কে দাউদকান্দি উপজেলা প্রশাসনের সংবর্ধনা

প্রকাশিত: ৩:৫২ অপরাহ্ণ, জুন ২৪, ২০২২, 118 জন দেখেছেন

নূর মোহাম্মদ মোল্লা : কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে গত বুধবার বেলা ১১ টায় উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে সমন্বয় সভায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মহিনুল হাসানের সভাপতিত্বে পরিবেশ যোদ্ধা মতিন সৈকতকে সংবর্ধনা ও সন্মাননা স্মারক দেয়া হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মেজর অবঃ মোহাম্মদ আলী সুমন বলেন ‘মতিন সৈকত ব্যাক্তি প্রচেষ্টায় তিন বার জাতীয় পদকসহ সরকারিভাবে ছয়বার চট্টগ্রাম বিভাগে শীর্ষ স্থান অর্জন অর্জন করে দাউদকান্দি উপজেলাকে বারবার সন্মানিত করেন। তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পুরস্কৃত হয়ে আমাদেরকে গৌরবান্বিত করুক। আমাদের দায়িত্ব হলো পরিবেশ উন্নয়নসহ সব বিষয়ে তাকে সহযোগিতা করা।’

বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ তারিকুল ইসলাম নয়ন, উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ সারোয়ার জামান, প্যনেল মেয়র রকিবুল ইসলাম রকিব, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সহ সমন্বয় পরিষদের সদস্যবৃন্দ।

৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি উপস্থিত থেকে পরিবেশ পদক প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে দাউদকান্দির আদমপুরের কৃতি সন্তান মতিন সৈকতের হাতে পরিবেশ পদক তুলে দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোঃ সাহাব উদ্দিন এমপি, উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার এমপি, সংসদীয় স্হায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি, সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ।

পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যাক্তিগত ক্যাটাগরিতে চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে মতিন সৈকত প্রথম জাতীয় পরিবেশ পদক অর্জন করেন।

পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবন ব্যাবহার ও সম্প্রসারণে ২০১০ ও ২০১৭ সালে মতিন সৈকত দুইবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকে ভূষিত হন। পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে ৬ বার সরকারিভাবে চট্টগ্রাম বিভাগে শীর্ষস্থান অর্জন করেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত জাতীয় পরিবেশ পদক ২০২১ স্মারক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়। ‘জনাব এম, এ মতিন (মতিন সৈকত) ১৯৮৭ সন থেকে পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছেন। মাছের অভয়াশ্রম সৃষ্টি, বোরোধান উৎপাদনের জন্য তিনি টামটা-বিটমান খাল, সুন্দলপুর খালসহ কুমিল্লা জেলার কালাডুমুর নদীর ১১ কিলোমিটার খননের আন্দোলনকারী। নির্মল পরিবেশ, বিষমুক্ত ফসল, নিরাপদ খাদ্য, খাল পূনঃখনন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি, বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কীটনাশক বর্জন, ফসলি জমিতে পার্চিং, সেক্স ফেরোমন ট্যাপ স্হাপন, জৈব পদ্ধতিতে ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ দমন, রাসায়নিক সার নিরুৎসাহিতকরণ, জৈবসার, খামারজাত সার, কম্পোস্ট সার, সবুজসার ব্যাবহারে উদ্বুদ্ধকরণ এবং সমন্বিত বালাই ব্যাবস্থাপনা বা আইপিএম পদ্ধতির অনুসরণে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন।

জনাব মতিন সৈকত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছেন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে তিনি ১০০০টি আহত ও ধৃত পাখি, ০৪টি বিরল প্রজাতির বন বিড়ালের ছানা, ০২ টি বেজি, ১০ টি গুইসাপ ও ৬টি শিয়াল উদ্ধার ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করে পরিবেশে অবমুক্ত করেছেন। নিজ গ্রামে পাখির বাসা করার জন্য হাঁড়ি, কলসি, ঝুড়ি দিয়ে বাসা তৈরি করে গ্রামটিকে পাখির অভয়াশ্রম তৈরির প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ উৎসব, বিজ্ঞান উৎসব, পাখি মেলা, পরিবেশ বিষয়ক সেমিনার, আলোচনা সভা, হাট সভা, কৃষকদের সাথে ক্ষেতে খামারে বৈঠক, উঠান বৈঠকসহ স্কুল কলেজে পরিবেশ বিষয়ক অনুষ্ঠান উদ্বুদ্ধকরণে সার্বক্ষণিক কাজ করে আসছেন।

মতিন নিজ এলাকা কুমিল্লার দাউদকান্দি প্লাবন ভূমি মাছ চাষে মডেল। এ মডেলের অন্যতম উদ্যোক্তা মতিন সৈকত। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যাবহারের ফলে বোরোধানে রাসায়নিক সারের ৭০ ভাগ কমানো সম্ভব হয়েছে। প্রত্যেক ধানের জমিতে পার্চিং করার ফলে পাখি বসে পোকামাকড় খাওয়ার কারণে কোন রকম বিষ বা কীটনাশক ব্যাবহার করতে হয়না। কুমড়া, বাঙ্গী জাতীয় ফসলে সেক্স ফেরোমন ট্যাপ ব্যাবহারের ফলে পেস্টিসাইড লাগেনা। যে কোনো ফসলে, মাছে যাতে ফরমালিন, কার্বাইড, বিষাক্ত রং ব্যাবহার না করা হয় সে জন্য এলাকায় ঢোল পিটিয়ে, মাইকিং করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করছেন। বিষ, ফরমালিন, কার্বাইড বর্জনে কৃষক, উৎপাদক, ভোক্তা সকলের সচেতনতার জন্য মানববন্ধন, সমাবেশ, প্রচারপত্র বিলি, বিজ্ঞাপন দেওয়াসহ নানারকম কর্মসূচি পালন করেছেন। কম সেচ দিয়ে পানির অপচয় রোধে বোরোধানে এ,ডাব্লিউ, ডি (অল্টারনেট ওয়েটার এন্ড ড্রাই) ব্যাবহারে কৃষকদের অনুপ্রাণিত করছেন।
সারা দেশের মহাসড়কের পাশের আবর্জনাকে সিটিজেন ফার্টিলাইজার বা নাগরিক সার রুপান্তরিত করার জন্য তিনি আন্দোলন করছেন। দূষণ নিয়ন্ত্রণে মহাসড়কের দুই পাশের ময়লা-আবর্জনা সরানোর জন্য সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি কয়েকটি অঞ্চলে নিজস্ব উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতার কাজ চালিয়েছেন। নিজ গ্রামে পরিবেশ বান্ধব বন্ধু চুলার ব্যাবহার, প্রচার ও প্রসারে তিনি অগ্রণি ভূমিকা পালন করেছেন।

দাউদকান্দি উপজেলার ১৫৪টি আই,পি,এম-আই,সি,এম ক্লাবকে সংগঠিত করে দাউদকান্দি উপজেলাকে দেশের বৃহত্তম আইপিএম উপজেলায় পরিণত করেছেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতার জন্য স্কুলের আঙ্গিনাসহ আশপাশ পরিস্কার করা, গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যায় উৎসাহিত করে চলছেন।

তিনি বিনামূল্যে গাছের চারা বিতরণের জন্য নার্সারি স্হাপন করেছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ অবদানের জন্য ৪ বার চট্টগ্রাম বিভাগে কৃতিত্ব অর্জন করেন। সৃজনশীল কাজের জন্য তিনি মহামান্য রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন পত্র পেয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবন ব্যাবহার ও সম্প্রসারণের জন্য তাকে ২০১০ ও ২০১৭ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার দেয়া হয়।’