দুইশ টাকায় ২৬ বছর বোরোধানে সেচ দিচ্ছেন পরিবেশ যোদ্ধা মতিন সৈকত

প্রকাশিত: ৯:৫৫ অপরাহ্ণ, মে ৩, ২০২১, 560 জন দেখেছেন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

বোরোধান উৎপাদনে সেচের কোনো বিকল্প নাই। ভাত বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য। বোরোধান ৭০% খাদ্যের যোগান দেয়। বোরোধানের জাতভেদে আয়ুষ্কাল পাঁচ মাস। বোরোধানের জমিতে মাসে কয়েকবার সেচ দিতে হয়। বোরোধান উৎপাদনের মূল মৌসুম হচ্ছে খরার সময়। বিশেষ করে পৌষ থেকে জৈষ্ঠ ছয় মাস। এ সময় স্বাভাবিকভাবেই খাল-নদী শুকিয়ে যায়। পানির স্তর নিচে নেমে যায়। পানি স্বল্পতা সেচের বিপর্যয় সৃষ্টি করে। বোরোধানের জমিতে বেশির ভাগ সময় পানি সংরক্ষণ করতে হয়। কুশি গজাতে, গাছ সম্প্রসারণ এবং ভালো ফলনের জন্য সেচের পানি অপরিহার্য। যে কোনে জায়গায় বোরোধান চাষে কৃষককে ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত মৌসুমব্যাপি সেচের খরচ দিতে হয়। সেখানে এককালীন বিঘাপ্রতি মাত্র দুইশ টাকার বিনিময়ে ১৫০ বিঘা জমিতে কৃষককে ২৬ বছর মৌসুমব্যাপি ধান রোপন থেকে পাকা ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত সেচ সুবিধা দিয়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে দুষ্টান্ত স্হাপন করেছেন কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার আদমপুরের পরিবেশ যোদ্ধা অধ্যাপক মতিন সৈকত।

তার নিজ গ্রাম আদমপুর এবং পুটিয়া ও সিঙ্গুলা তিন গ্রামের মধ্যবর্তী ১৫০ বিঘা বোরোধানের জমিতে মাত্র দুইশ টাকা বিঘাপ্রতি মৌসুমব্যাপি সেচের পানি সরবরাহ করে কৃষকেকে ধান উৎপাদনে সহযোগিতা করছেন। ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নের আদমপুর গ্রামের মোঃ রোশন আলী, ফুল মিয়া, সিংগুলার আবদুল লতিফ, মোঃ বাচ্চু মিয়া, পুটিয়ার মুক্তিযোদ্ধা মোঃ তৌহিদুল ইসলাম মোল্লা জানান ‘মতিন সৈকত ২৬ বছর যাবত আদমপুর বোরোধানের মাঠে মাত্র দুইশ টাকা বিঘাপ্রতি মৌসুমব্যাপি ধান লাগানো থেকে পাকা ধান কাটা পর্যন্ত যার যতোবার সেচের পানি দরকার ততোবারই সেচ সুবিধা দিয়ে আসছেন এককালীন মাত্র দুইশ টাকার বিনিময়ে।
বিভিন্ন স্থানে বোরোধানের জমিতে সেচের খরচ দিতে হয় ১২০০থেকে ২০০০টাকা পর্যন্ত। মতিন সৈকতের মত কেউ এত ফ্রী সেচ সুবিধা দেয়না। এছাড়াও মতিন সৈকত প্রত্যেক বছর বোরোধানের জমিতে ঝাটা-জিংলা পুতে দেন যাতে পাখি বসে পোকামাকড় খেয়ে ফসলকে নিরাপদ রাখে। এতে কোন ধরনের কীটনাশক বা বিষ ব্যাবহার করা লাগেনা। বিষ, মাটি, পানি, বাতাস, ফসল এবং শরীরের ক্ষতি করে। তিনি ফসলের মৌসুমে ঢোল পিটিয়ে মাইকিং করে এলাকার কৃষকদের কীটনাশক বা বিষের ভয়াবহ ক্ষতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করেন।
এছাড়াও সেচের উৎস কালাডুমুর নদ মতিন সৈকতের উদ্যোগে ১১ কিলোমিটার পূনঃখনন হচ্ছে।” একমাত্র ফসল বোরোধান উৎপাদনের পরে এখানকার প্লাবনভূমির জমিগুলো বর্ষায় অলস অনাবাদি পরিত্যক্ত থাকত। ঘাস, কচুরিপানা, আবর্জনা জমে জঞ্জাল তৈরি হত। পরিস্কার করতে বিঘাপ্রতি ৪/৫ হাজার টাকা লাগত। বেকারত্ব, অলসতা, সামাজিক অবক্ষয়রোধে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গণশেয়ারের ভিত্তিতে স্হানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে তাদের সহযোগিতায় মতিন সৈকত আদমপুর, পুটিয়া, সিংগুলা তিন গ্রামের মধ্যবর্তী ২৫০ বিঘা জমিতে আপুসি এবং পুটিয়াতে ১০০বিঘা জমিতে বিসমিল্লাহ, আদমপুর,পুটিয়া, বিটমান তিন গ্রামের মাঝখানে ৩৫০বিঘা জমিতে আপুবি মৎস্য চাষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। এসব প্রকল্পে প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার মাছ উৎপাদন হয়। স্হানীয় জনগণের ব্যাবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থ ও পুষ্টির চাহিদা পুরণ হচ্ছে। বোরোধান উৎপাদনে খরচ কমানোর সাথে বর্ষায় অনাবাদি জমিতে মাছ চাষ করার ফলে কৃষক লাভবান হচ্ছেন। বিঘাপ্রতি ১৪/১৫ হাজার টাকা করে প্রতি বছর জমিনের ভাড়া বাবদ নিচ্ছেন।


দাউদকান্দি উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ সারোয়ার জামান বলেন ‘ আদমপুর গ্রামের শিক্ষক মতিন সৈকত উপজেলার কৃষকদের খুব আপনজন। সরকারের পাশাপাশি তৃণমূলে কৃষকের পাশে থেকে সব সময় সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন। তিনি ২৬ বছর ধরে নাম মাত্র মূল্যে মাত্র দুইশ টাকায় বিঘাপ্রতি সেচ ব্যবস্থা করে কৃষকদের সেবা দিয়ে আসছেন। তিনি কৃষকদের যেভাবে সংগঠিত করে তাদের সহযোগিতা করছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।’
দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মেজর (অবঃ) মোহাম্মদ আলী সুমন উল্লেখ করেন। “মতিন সৈকত কৃষি ও পরিবেশ উন্নয়নে ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে দেশব্যাপী দৃষ্টান্ত স্হাপন করেছেন। বিষমুক্ত ফসল, নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন, খাল-নদী পূনঃখনন, বন্য প্রাণীসহ পাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত, জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি বহুমুখী সামাজিক আন্দোলন করে যাচ্ছেন। মহাসড়কের দুই পাশের ময়লা আবর্জনা, শহর- নগরের বর্জ্যকে রুপান্তরিত করে সিটিজেন ফার্টিলাইজার বা নাগরিক সার তৈরি কারার জন্য সরকারের নিকট জোর দাবি জানিয়ে আসছেন। কালাডুমুর নদী পূনঃখনন মতিন সৈকতের আন্দোলনের ফসল। পরিবেশ উন্নয়নে নিবেদিত মতিন সৈকত।’
সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অবঃ) মোঃ সুবিদ আলী ভূইয়া বলেন ‘মতিন সৈকত কৃষি, পরিবেশ উন্নয়নে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে জাতি গঠনে অবদান রাখছেন”।
বাংলাদেশে মাত্র ১০টি ইউনিয়নকে সরকারিভাবে আইপিএম মডেল ইউনিয়ন ঘোষণা করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। পরিবেশ বান্ধব কৌশল অবলম্বনে নিরাপদ সবজি উৎপাদনে মতিন সৈকতের ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়ন আইপিএম মডেল ইউনিয়নের মর্যাদা পেয়েছে। মতিন সৈকত তিন দশকের বেশি সময় ধরে বিষমুক্ত ফসল, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, মাত্র দুইশ টাকা বিঘাপ্রতি বোরোধান মৌসুমব্যাপি ২৬ বছর যাবত সেচ সুবিধা প্রদান, খাল-নদী পূনঃখনন, কালাডুমুর নদের ১১ কিলোমিটার পূনঃখনন, প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি এক হাজারের বেশি পাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত করণ, সবুজায়ন আন্দোলন, মহাসড়কের পাশের এবং শহর নগরের ময়লা আবর্জনাকে থেকে সিটিজেন ফার্টিলাইজার প্রক্রিয়াকরণ সহ বহুমুখী সামাজিক আন্দোলনে নিরন্তর নেতৃত্ব দিয়ে চলছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে চার বার চট্টগ্রাম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
‘অব দ্যা বেটেনটেক দি ক্রুসেডার, এরিয়েল প্রেট্রিয়ট, এম্যানটু বিফলোইড, এন লাইটেড মতিন সৈকত, মতিন সৈকত এরিয়েল ফ্রেন্ড অব ফারমার্স ইন কুমিল্লা
শিরোনামে অভিহিত হয়েছেন।